কৃষ্ণচূড়া

- নাজমুল আহসান

মজনু মিয়া বসে আছে এক ঘণ্টার উপরে। সন্ধ্যা পরপরই গ্রামে গহীন রাত নেমে আসে। এতক্ষণ দূরের বাড়িগুলোতে দু-একটা টিমটিমে আলো জ্বলছিল। তার চোখের সামনে শেষ আলোটা টুপ করে নিভে গেল। মজনু মিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

মজনু ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করছে। এই এক-দেড় ঘণ্টা সময়ে একটা ট্রেনও আসেনি। অথচ অন্য সময় হলে দেখা যেত- পাঁচ মিনিট পর পর একটা করে ট্রেন কু-ঝিকঝিক করে চলে যাচ্ছে। তার আসলে ভুল হয়ে গেছে- এখানে আসার আগে ট্রেনের শিডিউল দেখে আসা উচিৎ ছিল। অযথা সময় নষ্ট করার মানে হয় না।

চারপাশে ভূতুড়ে কালো। যতদূর চোখ যায়, আলোর লেশ নেই। রেললাইনের দু’পাশে আবাদি জমি। সবচেয়ে কাছের বাড়িটাও অন্তত আধা মাইল দূরে। সে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করল। মাথার উপরে অন্ধকারের ছাতার মতো একটা বিরাট কৃষ্ণচূড়া গাছ। কৃষ্ণচূড়া ফুলটা যেমন সুন্দর, নামটাও। আরও একটা সুন্দর নাম আছে কৃষ্ণচূড়ার, মজনু মনে করার চেষ্টা করল- কী নাম? গুলশান নাকি গুলফাম?

জায়গাটাতে ভয়ানক মশার আনাগোনা। ত্রিশ হাত পিছনে একটা ডোবা; ডোবার পচা পানিতে মশারা আণ্ডাবাচ্চার চাষ করেছে। মজনুর মনে হল, মানুষ না হয়ে তার আসলে মশা হওয়া উচিৎ ছিল। কোনো ঝুটঝামেলা থাকত না। সারাদিন ঘুমাত। বেশি ক্ষুধা পেলে বাইরে বেড়িয়ে দুই-চার ফোটা রক্ত খেয়েই বাসায় ঢুকে পড়ত; তারপর আবার ঘুম!

ঘুমের কথা ভাবতেই মজনুর মনে পড়ল, তার পকেটে তিন পাতা ঘুমের ট্যাবলেট আছে। আত্মহত্যার জন্যে ঘুমের ট্যাবলেট মোটামুটি জনপ্রিয়। বিশেষ করে যারা মরতে চায় না, তাদের কাছে। দুইটা ট্যাবলেট খেয়ে মটকা মেরে থাকতে হবে; আর ভান করতে হবে দুই পাতা ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছি!

আত্মহত্যার মাধ্যম হিসেবে মজনুর প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ঘুমের ট্যাবলেট। পরে মনে হল, বিষয়টাতে ঝুকি আছে। যদি এক পাতা ট্যাবলেট খাওয়ার পরও কোনোভাবে টিকে যায়, তাহলে খুব কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। মানুষকে মুখ দেখাতে পারবে না। লজ্জায় তখন আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকবে না! তাছাড়া ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ার পর যদি হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর দুর্ভাগ্য হয়, তাহলে তো সর্বনাশ। গলা দিয়ে পাকস্থলী পর্যন্ত পাইপ ঢুকিয়ে দেবে। তারচে’ ট্রেনের নিচে ঝাপ দেওয়াটা সুবিধাজনক। মিস হওয়ার ঝুকি নেই, সবচেয়ে বড় কথা- এক সেকেন্ডের মধ্যেই খেল খতম।

ট্রেন আসার কোনো নমুনা দেখা যাচ্ছে না। এখন সময় কত? মজনু পকেটে হাত দিল, মোবাইল ফোনটা নেই। কোথাও পড়ে গেছে নাকি পকেটমার নিয়েছে? হঠাৎ করে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। মোবাইল ফোন গেছে এটা সমস্যা না, সমস্যা হচ্ছে এখন সময় কত সেটা জানা যাচ্ছে না। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের কাছে সময়ের দাম খুব বেশি।

আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে আজ ট্রেন বন্ধ। কিংবা হয়তো কোথাও কেউ রেললাইনের স্লিপার তুলে ফেলেছে, ট্রেন আসতে পারছে না। মজনু ছটফট করতে শুরু করল। পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে নাকি! অবশ্য ট্রেন না এলেও বিশেষ সমস্যা নেই, ট্যাবলেট তো আছেই। তারপরও ‘মনে মতো করে মরা’ বলে একটা ব্যাপার আছে। মজনু সিদ্ধান্ত নিল আরও ঘণ্টাখানেক ট্রেনের অপেক্ষা করবে; যদিও এরকম সময়ে একটা করে সেকেন্ড এক ঘণ্টার মতো মনে হচ্ছে। এর মধ্যে ট্রেন না এলে দুই পাতা ট্যাবলেট খেয়ে গাছতলায় শুয়ে থাকবে। পিঠের ব্যাগে আধা বোতল পানি আছে।

গঞ্জে একটা ছোটখাটো মুদির দোকান ছিল মজনুর। বেশ ঘনঘন কয়েকটা ব্যবসা বদলানোর পর এই ব্যবসা যখন জমে উঠতে শুরু করেছে, তখন বাবা-মা বলতে গেলে জোর করেই মজনুর বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়েশাদি নিয়ে মজনু মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু সে আবিষ্কার করল, বিয়ের পর তার জীবন একেবারেই পাল্টে গেছে। সারাদিন কাজ শেষে ঘরে ফিরে আর আগের মতো ‘কাল কী করব’ -এই দুশ্চিন্তা হতো না। অল্পদিনের মধ্যেই মজনুর জীবনে একটা স্থিতি আর ফুরফুরে ভাব চলে এল।

রেখা খুবই ভালো মেয়ে। সত্যি বলতে, মজনুর জন্যে আশাতীত ভালো বউ। দেখতে সুন্দর, ভদ্র আর ঘরকন্নার কাজে পটু। লেখাপড়া জানা মেয়ে; স্কুল পাশ করে কলেজে ভর্তিও হয়েছিল। সে আরও পড়াশুনা করুক –এটা রেখার বাবা-মা যেমন চাচ্ছিলেন, মজনুরও ইচ্ছে ছিল। কিন্তু রেখা রাজি হয়নি। পড়াশুনা চালিয়ে গেলে সংসার দেখাশুনা করতে পারবে না –এই যুক্তিতে সে পড়াশুনা বন্ধ করে দিল।

মজনু যখন নিজেকে সুখী ভাবতে শুরু করেছে, তখনই একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটতে লাগল। বিয়ের মাস খানেক পর এক রাতে মজনুর দোকান চুরি হল। ব্যবসা একটা বড়সড় ধাক্কা খেল। ধাক্কা সামাল দিতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হল। এবং ঋণ নেওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই মজনুর মনে হল, ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। এদিকে ঋণের কিস্তি আর সংসার খরচ চালাতে গিয়ে মজনুর যখন নাকাল অবস্থা; তখন একদিন তার দোকান আগুনে পুড়ে গেল। মজনু বুঝতে পারল, এটাকে ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’ বলে।

আত্মীয়স্বজন আর বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ধার-দেনা করে মজনু চলতে লাগল। আর্থিক সংকট আর দুশ্চিন্তা থাকলেও তার ঘরে সুখের অভাব ছিল না। রেখা সবসময় সান্ত্বনা দিত, সব ঠিক হয়ে যাবে। সব ঠিক হয়ে যাওয়ার আগেই ঘটনাটা ঘটল। একদিন মাঝরাতে রেখার কান্নাকাটি শুনে তার ঘুম ভাঙল। রেখা হাউমাউ করে কাঁদছে। মজনু জিজ্ঞেস করলেও রেখা কিছু বলল না।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কিছু না। মজনু ভুলে যেত; কিন্তু এর তিন-চার দিন পর আবার এক রাতে একই ঘটনা ঘটল। অনেকটা জোরাজুরি করার পর রেখা যেটা বলল, সেটা অবিশ্বাস্য- সে রেখাকে মেরে ফেলার জন্যে গলা টিপে ধরেছিল। মজনু বউকে বুঝানোর চেষ্টা করল, রেখা নিশ্চয়ই স্বপ্নে দেখেছে অথবা মজনুই ঘুমের ঘোরে এরকম করেছে। রেখা ব্যাপারটা মেনে নিলেও মজনুর ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠল। সে কি সত্যি রেখাকে মেরে ফেলতে চাচ্ছিল? টাকাপয়সা নিয়ে ঝামেলা হওয়ার পর থেকে তার মাথা ঠিক নেই; কিন্তু বউকে মেরে ফেলার মতো মানসিক অবস্থা তো হয়নি! সে কি মনে মনে নিজের দুর্দশার জন্যে রেখাকে দায়ী ভাবতে শুরু করেছে? রেখা কি অলক্ষ্মী? নিজের উপর খুব ঘৃণা হতে লাগল।

ছোটবেলায় ঘুমের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস ছিল। স্কুলে পড়ার সময় এক সকালে ঘুম থেকে উঠে মজনু দেখল তার পড়ার টেবিলে বইপত্রের উপর ছোটবড়, কাদায় মাখামাখি কাচা আম। কে রাখল, কে রাখল – চিল্লাচিল্লি করার পর সে আবিষ্কার করেছিল তার হাত-পায়ে কাদা। ঝড়ের রাতে ঘুমের মধ্যেই বাইরে গিয়ে আম কুড়িয়ে এনেছিল।

পরের সপ্তাহে রেখা বাবার বাড়িতে চলে গেল। আগের রাতে মজনুর যখন ঘুম ভেঙেছিল, তখন সে একটা রড দিয়ে রেখাকে বেধড়ক মারছে। মজনু রেখাকে ভালবাসত বলেই তাকে আটকানোর চেষ্টা করেনি; কে জানে কোনো দিন হয়তো সত্যি রেখা খুন হয়ে যাবে।

বসে থাকতে থাকতে ঝিমুনির মতো এসে গেছে। মজনু স্বপ্নে দেখল- রেখা ওর হাত ধরে টানছে, ‘এইখানে বসে কী কর তুমি?’
-‘সুইসাইড করার জন্যে বসে আছি।’
-‘সুইসাইড করবে ভালো কথা, তাই বলে মশার মধ্যে বসে থাকবে? মশা কামড়াচ্ছে না? কয়েল জ্বালিয়ে দেব?’
মজনুর মনটা আনন্দে ভরে গেল। বুকের মধ্যে হুহু করে উঠল, ‘আমাকে মশা কামড়ালে তোমার কোনো সমস্যা আছে?’
-‘অবশ্যই আছে। তুমি আমার একমাত্র বর না? দাঁড়াও, কয়েল জ্বালিয়ে দিচ্ছি।’
রেখা কয়েলের প্যাকেট থেকে একটা বাঁশি বের করল। ছোট-গোলগাল একটা বাঁশি। তারপর বাশিতে ফু দিতে শুরু করল। মজনু বলল, ‘কী ব্যাপার, বাঁশিতে ফু দিচ্ছ কেন? কয়েল জ্বালাও।’
রেখা খিলখিল করে হাসতে লাগল, ‘তোমার এখন কয়েলের চেয়ে বাঁশির বেশি দরকার।’ দুই-তিন সেকেন্ড পরপর রেখা বাঁশিতে লম্বা করে ফু দিতে লাগল। মজনু খেয়াল করল, যত সময় যাচ্ছে, বাঁশির শব্দের তীব্রতা ততই বাড়ছে।

সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। ট্রেন চলে এসেছে। হেডলাইটের আলো আর হুইসেলের শব্দে মজনুর মনে হল, এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য সে আর কখনো দেখেনি। তার বুকের ভিতরে স্পষ্ট একটা মুক্তির উল্লাশ।
ব্যাগের মধ্যে একটা চিঠি আছে। সাথে কিছু কাগজপত্র আর হাজার পাঁচেক টাকা। সে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে কৃষ্ণচূড়ার একটা ছোট ডালের সাথে ঝুলিয়ে দিল। পিছন ফিরে ট্রেনের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। তার শ’ খানেক হাত দূরে রেললাইনের উপর একটা মানুষ শুয়ে আছে। ট্রেনের হেডলাইটের আলোতে লোকটার লম্বা ছায়া পড়েছে রেললাইনের উপর। কী আশ্চর্য! মানুষটা কি মরে যাবে নাকি?

মজনু ছায়া দেখে দ্রুত হিসাব করার চেষ্টা করল। ট্রেন এখনো বেশ দূরে। গতিও কম। দৌড়ে গেলে সে হয়তো ট্রেনের আগেই লোকটার কাছে পৌঁছতে পারবে। একটা চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। আবার মনে হল, ‘ধুর! মরলে মরুক, আমার কী?’

দ্বিধাদ্বন্দে কয়েক সেকেন্ড সময় চলে গেল। মজনু সিদ্ধান্ত নিল লোকটাকে বাঁচাতেই হবে। সে রেললাইনের উপর দিয়ে ছুটতে শুরু করল। বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসছে ট্রেন। মজনুর মনে হল ট্রেনের গতি হুট করে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে আর সেই সাথে তার পা অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু একটা মানুষকে তো এভাবে মরতে দেওয়া যায় না। সে পাগলের মতো দৌড়াতে লাগল। হঠাৎ তার মনে পড়ল, কৃষ্ণচূড়ার আরেক নাম গুলমোহর।

(মোট পড়েছেন 244 জন, আজ 4 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন