কর্মসংস্থান ব্যাংকের খালা

- নাজমুল আহসান

আমি মোবাইল ফোন ব্যবহার করা শুরু করেছি কিছুটা আগাম! আমি যখন নিজের ব্যক্তিগত ফোন পেলাম, তখনও পুরো এলাকায় মোবাইল ফোনের সংখ্যা হাতে গোনা। আর ওই সময়টায় আমার বয়সী কারও কাছে ফোন থাকাটা একেবারেই অস্বাভাবিক ছিল; বিশেষ করে সেই গ্রাম-মফস্বল এলাকায়। কারও পকেটে ফোন বেজে উঠলে ধরে নেওয়া হত, তার ফোন-ফ্যাক্সের দোকান আছে। আমার মনে আছে, এলাকার এক বয়স্ক ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- তোমার এইটা কি গ্রামীণ না নকিয়া?

গ্রামীণফোন ২০০৫ সালে ডিজুস নামের একটা নতুন সংযোগ বাজারে ছাড়ল। এই ডিজুস তখন ছেলেপেলেদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিল। দুই টাকা সাতাশি পয়সা দিয়ে সারারাত কথা বলা যেত! মুরব্বিরা এদের নাম দিলেন “ডিজুস পোলাপান”। বাজারে আসার কয়েকদিনের মাথায় আগের সংযোগটা বাদ দিয়ে একটা ডিজুস কিনে ফেললাম। এবং সেটা আজ অবধি ব্যবহার করছি।

বেশিদিন ধরে একই সীম যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁরা “রং-নাম্বার” ঝামেলার সাথে পরিচিত হওয়ার কথা। পুরনো দিনের ল্যান্ডফোনের মতো আমার ডিজুসে রং-নাম্বার ফোন আসা শুরু হল। অবশ্য শুরুটা ছিল অনেক আগেই।

প্রথম দিকে প্রায়ই যে ফোনটা আসত, সেটা ছিল শিমুর। নতুন নতুন নম্বর থেকে ফোন আসত। মাঝ রাতে ফোন বেজে উঠত। রিসিভ করার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে একটা হাঁসের মতো কণ্ঠ বলত- ‘হ্যালো, শিমু?’

একবার এক ভদ্রলোক ফোন দিলেন। সালাম দিলাম। উনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন- ‘মান্নান ভাই কই?’
বলা বাহুল্য, এটা আমার বাবার নাম। তারমানে বাবার কোনো বন্ধু ফোন দিয়েছেন। আমি আবার সালাম দিলাম, আঙ্কেল ডাকা শুরু করলাম। পরে দেখা গেল এটা রং-নাম্বার ছিল।
এই ভদ্রলোক পরে একাধিকবার ফোন দিয়েছিলেন, ‘মান্নান ভাই কই?’

একদিন এক প্রবাসী ফোন দিলেন। শুরুতেই বুঝে ফেললাম এটাও ভুল নাম্বারে এসেছে। কিন্তু ভদ্রলোক মরিয়া হয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন যে তিনি ঠিক নাম্বারেই ফোন দিয়েছেন। অনেকক্ষণের চেষ্টায় তাকে বোঝানো গেল।
ফোন কেটে দেওয়ার কয়েক মিনিটের মাথায় উনি আবার ফোন দিলেন। ‘ভাই, আমার বাড়ি মুন্সিগঞ্জ। সৌদি আরব থাকি। এবার দেশে গিয়ে আমার শ্যালকের ফোন নাম্বার আনছি। সে নাম্বার দিতে ভুল করছে! দেখেন না ভাই, আমারে কোনো হেল্প করতে পারেন কিনা। কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারতেছি না!’
আহারে!

সবচে’ বেশি যে রং-নাম্বার ফোনটা আমি পাই, সেটা হচ্ছে শামিম ভাইয়ের। এই শামিম ভাইয়ের বাড়ি বগুড়ায়, মাটিডালি মোড়ে তাঁর অটোমোবাইল সার্ভিসিং-এর ব্যবসা আছে।
প্রায়ই ফোন আসে, ‘শামিম ভাই, গাড়ির কী অবস্থা?’
– ‘শামিম ভাই, ট্যাকা পাইছেন?’
– ‘শামিম ভাই, ডেরাইভার কই?’
একদিন এরকম একজন ফোন দিয়েছেন, শামিম ভাইকে চান। আমি তাকে কলব্যাক করলাম। কাহিনীটা কী জানার জন্যে। যা জানলাম, সেটা আতঙ্কিত হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। এই শামিম ভাই তাঁর ভিজিটিং কার্ডে ভুল করে আমার নাম্বার ছেপেছেন!

আজ সকালে ঘুম ভেঙ্গেছে এক মহিলার ফোনে। ‘ছার, আপনি কি অফিসে আইছুইন?’
আমি বললাম, ‘কে?’
মহিলা বললেন, ‘আমি সালেহা। কর্মসংস্থান ব্যাংকের খালা!’

(মোট পড়েছেন 291 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

৩টি মন্তব্য

  1. মোঃআয়নাল হক md aynal বলেছেন:

    (y) -{@ দারুন অনুভূতি প্রকাশ মোবাইলে
    নাজমুল ভাই

মন্তব্য করুন