মৃত্যুকথন-৩

- নাজমুল আহসান

আমি লেখাপড়া-জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই পড়াচোর ছিলাম। বাবা সরকারী চাকুরী করতেন। দেশের আনাচেকানাচে তাঁর পোস্টিং থাকত। মাসে একবার করে বাড়িতে আসতেন; আর প্রতিবার তাঁর কাছে আমার পরীক্ষা দিতে হত। দু-তিনদিন থাকলে, একেক দিন একেক সাবজেক্ট। দেখা যেত বাংলা আর গণিত পরীক্ষার দিন ছাড়া অন্যদিনগুলোতে আমার প্রচণ্ড মাথাব্যথা(?) থাকত! কারণ, এই দুইটা সাবজেক্ট না পড়লেও ‘বাবার পরীক্ষা’য় ভাল করতাম। বাবা চলে গেলে আমার পড়াশুনা চলত ঘড়ি ধরে। নয়টা বাজলেই পড়া শেষ। পড়তে বসে সেকেন্ডে সেকেন্ডে ঘড়ির দিকে তাকাতাম। সময় যেন কাটে না! রেজাল্ট ভালো করতাম বলেই হয়তো বাবা-মা মেনে নিতেন। কীভাবে যেন প্রতিবার স্কুলের পরীক্ষায় ফার্স্ট হতাম!

সেদিনও পড়তে বসে নয়টার অপেক্ষায় আছি। আমার টেবিলের পাশে খাটে মা শুয়ে আছেন। হঠাৎ জানালায় ধুপধাপ শব্দ। বাইরে থেকে কেউ ডাকছে- ‘আপা, ও আপা!’ জানালা খুললাম। জানালার বাইরে আনিস মামা হাঁপাচ্ছেন। মা জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে; আনিস মামা কথা বলতে পারছেন না।
আনিস মামা নানাবাড়ির রাখাল। খুব ভালো গান গাইতে পারেন। দরাজ কণ্ঠে গান ধরেন- ‘ও সখিনা, গেছস কিনা ভুইলা আমারে…’। তাঁর কাছে কৌতুকের বিরাট ভাণ্ডার আছে; প্রায়ই আমাকে কৌতুক শোনান। আমি আনিস মামাকে খুব পছন্দ করি।
আমি বললাম- ‘মামা, ভিতরে আসেন।’
মামা বললেন -‘চাচাজান পইড়া গেছে।’

আনিস মামার চাচাজান মানে আমার নানা। নানা আলেম মানুষ। আশেপাশের এলাকাতেও তাঁর অত্যন্ত সুনাম। তুখোড় ছাত্র ছিলেন। মেট্রিক পরীক্ষাতে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় হয়েছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় চাকুরী করে কিছুদিন আগে অবসর নিয়েছেন। তাঁর চার সন্তানের মধ্যে আমার মা সবচে’ বড়, এরপর একমাত্র খালা। চাকুরী খুঁজে ক্লান্ত হয়ে বড়মামা মাত্রই ব্যবসা শুরু করেছেন। ছোটমামা পড়াশুনা করছেন। বেশ অভিজাত আর পরিপাটি পরিবার।
খালু পাবনা থেকে পঞ্চগড়ে বলদি হয়েছেন। আগের বাসা থেকে মালপত্র পঞ্চগড়ে নেওয়া হবে; নতুন বাসা ঠিক করা হয়নি বলে মালপত্র নিয়ে খালা প্রায় মাসখানেক এখানে ছিলেন। দু’তিনদিন আগেই গেছেন।

আমাদের বাড়ি থেকে নানাবাড়ি হাঁটাপথের দূরত্ব। মা, আমি আর আনিস মামা ছুটতে লাগলাম। এরমধ্যে আনিস মামা আমাদেরকে সংক্ষেপে ঘটনা বললেন। দুপুরে নানা আমাদের বাড়ি থেকে সরাসরি হাটে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে মাগরিবের পর গিয়েছিলেন কামলা ঠিক করতে। ফেরার পথে রেললাইন ধরে আসছিলেন; তখনই রাস্তার পাশে পড়ে গেছেন। উঁচু রাস্তা থেকে আনুমানিক পঁচিশ ফুট নিচে গড়িয়ে চলে গেছেন! হাটফেরত কোনো এক হাটুরে অন্ধকারে নীলচে আলো দেখে কাছে গিয়ে নানাকে অচেতন আবিষ্কার করেছে। তাঁর নীল পাঞ্জাবীর ভিতর দিয়ে হাতের টর্চের আলো ঠিকরে বের হচ্ছিল!

আমরা যখন পৌঁছলাম, রাত তখন নয়টা বা সাড়ে নয়টা হবে। বাড়ি ভর্তি মানুষ। আমরা উঠোনে পা দিতেই ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন বলে উঠল- ‘আহারে! চলে গেল!’

(মোট পড়েছেন 247 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

৩টি মন্তব্য

  1. মোঃআয়নাল হক md aynal বলেছেন:

    ভালো লগলো
    অনেক দিন পরে আসলাম
    মুক্তকষ্ঠ ব্লগে কেমন আছেন ভাইজান

    1. আরে আয়নাল ভাই যে! অনেকদিন পর। কেমন আছেন?
      আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি।

মন্তব্য করুন