মৃত্যুকথন-২

- নাজমুল আহসান

আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড় এক বন্ধুর সাথে আমাকে চুল কাটাতে পাঠানো হয়েছে। আমার মা দু’জনের চুল কাটানো বাবদ সেই বন্ধুটির হাতে পঁচিশ টাকা ধরিয়ে দিয়েছে। জনপ্রতি বারো টাকা লাগে চুল কাটাতে।

সময়কাল মোটামুটি সতের-আঠারো বছর আগে। ওয়ান-টোয়ানে পড়ি। দোকানপাট, রাস্তাঘাট ঠিকঠাক চিনি না। খেয়াল করলাম, আমার সেই বন্ধু আমাকে নিয়ে অলিগলি ঘুরছে। বেশ কয়েকটা সেলুনে গিয়েও বের হয়ে এলো। ব্যাপার কী? পরে বুঝতে পারলাম, সে এই পঁচিশ টাকা থেকে কিছু টাকা ‘মারিং’ করে দেওয়ায় ধান্দায় আছে। একবার একটা নাপিতের দোকানে গিয়ে দুজনের চুল কাটানো বাবদ পনের টাকা দিতে চাইল, নাপিত রাজি না হওয়াতে ষোল টাকাও বলল। এবারও নাপিত রাজি হল না; আমরা বের হয়ে এলাম!

শেষমেশ একজন পনের টাকায় রাজি হল। চুল কাটানো শেষ নাপিত এবার আমাদের নামধাম জিজ্ঞেস করতে লাগল। আমার বাবার নাম শোনার পর তিন টাকা ফেরত দিয়ে বলল, ‘যাও তোমার চুল কাটানোর টাকা তোমার বাবার কাছ থেকে নিয়ে নেব’! আমরা দুজন মিলে মোটাসোটা নাপিত ছেলেটাকে গালি দিতে দিতে বেরিয়ে এলাম।

স্বাস্থবান এই ছেলেটার নাম মিলন। একটু যখন বড় হয়েছি; লতিফ ভাইয়ের কাছে চুল কাটাই, তখন মিলন ভাইয়ের সাথে পরিচয় হল। সে তখন লতিফ ভাইয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট। অসম্ভব রকমের রসিক আর চাপাবাজ একজন মানুষ। হিসেব করলে আমার চেয়ে বারো-তের বছরের বড় হবে, কিন্তু অল্পদিনের আমার সাথে খাতির জমিয়ে ফেলল। একসময় দেখা গেল, আমি নিয়মিত মিলন ভাইয়ের কাছে চুল কাটাই। চুল কাটতে যে পনের-বিশ মিনিট সময় লাগত, পুরোটা সময় সে তার মুখ চালিয়ে যেত। আর্মি-দের চুল কাটানোর সময় কীভাবে এক সৈনিকের কানের নিচে ক্ষুর দিয়ে পোঁচ দিয়েছিল- এই গল্পটা আমাকে অন্তত ডজনবার শুনতে হয়েছে। আমি তার চাপাবাজি বুঝতে পারতাম, তবুও বিপুল আগ্রহ নিয়ে শুনতাম।

আমাদের একটা দোকানঘর ভাড়া নিয়ে জুয়েল ভাই সেলুন বানাল। এবং মিলন ভাই সেখানে কাজ করতে শুরু করল। এটা বছর চারেক আগের ঘটনা। আমি বাড়ি গেলেই সকাল-বিকাল মিলন ভাইয়ের সাথে দেখা হয়। মাঝে-সাঝে বসে বসে তার চাপাবাজি শুনি আর আশ্চর্য হই, দিলখোলা মানুষটা কী অপরিসীম ভালবাসা নিয়ে গল্প তৈরি করে।

আমাদের ‘প্রাইভেট’ দইঅলা পলকাটু কাকার বাড়ির পিছনে কীসের একটা সুড়ঙ্গ বের হল। এলাকায় সেটা নিয়ে হইচই। মিলন ভাই বিজ্ঞের মতো সেটা সুন্দর করে ব্যাখ্যা করল, ‘মাঝন সাব, এইটা আসলে হইছে কী জানো? এইটা আসলে মানুষের বানানো না!..’ মিলন ভাই আমাকে ‘মাঝন সাব’ ডাকত। মাঝন মানে হল মহাজন।

তারপর হঠাৎ-ই একদিন শুনি, মিলন ভাই মরে গেছে! কী আজব, মিলন ভাই মরে যাবে কেন! কতোই বা হবে বয়স; পঁয়ত্রিশ? শুনলাম হার্ট-এটাক হয়েছিল। হুট করেই মানুষটা চলে গেল। আমি ধাক্কা খেলাম।

(মোট পড়েছেন 168 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন