রিসিভার (পর্ব-১)

- নাজমুল আহসান

নাবিলার বিরক্তি চরমে পৌঁছে গেছে। ফোনে যে কেউ এতো উচুস্বরে কথা বলতে পারে, সেটা এই মহিলাকে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। নাবিলা আবার আড়চোখে মহিলার দিকে তাকাল। মহিলার পোশাকে বেশ ভদ্রতার একটা ছাপ আছে। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, দেখতে সুশ্রী। এই মহিলা ফোনে এমন কর্কশকণ্ঠে চেঁচামেচি করছেন ভাবা যায় না!

মৃদু একটা ধমক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল নাবিলা। চোখ বন্ধ করে এক-দুই-তিন গুনতে শুরু করল, দশ পর্যন্ত গোনা শেষ হলেই একটা ধমক দেবে! তার আগেই মহিলা আচমকা ফোন রেখে দিলেন, নাবিলার দিকে তাকিয়ে আগের মতোই খ্যানখ্যানে গলায় বললেন- ‘বুঝছেন, আমার ভাগ্নি। ছন্দা। আমার খুব ন্যাওটা। বান্ধবীর বার্থডে পার্টিতে কোন শাড়ি পড়বে সেটা শোনার জন্যে ফোন করছে! আপনি কিছু মনে করেন নাই তো?’
নাবিলা অবাক হয়ে গেল। চেনাজানা নেই, অপরিচিত মানুষের সাথে কেউ এভাবে কথা বলে নাকি! ভদ্রতার খাতিরে বলল- ‘না, না। কী মনে করব!’
-‘কিছুদিন আগে করছে কী শোনেন। ছন্দার এক বান্ধবীর বিয়ে হইছে,সেই বান্ধবী বাসররাতে কী কী করছে, সেইগুলা সে আমার কাছে ফোন দিয়ে বলতেছে! আরে বাবা, আমি হইলাম তোর খালা, খালার কাছে কেউ এইসব বলে! ঠিক কি না বলেন।’
নাবিলা বলল- ‘ঠিকই তো।’
মহিলা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বললেন- ‘অতি অবশ্যই ঠিক। আসলে হইছে কী জানেন- মা-মরা মেয়ে তো, লাজলজ্জা একটু কম।’
নাবিলা এবার একটু আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল- ‘আপনার আপন ভাগ্নি?’
-‘আপন মানে! ছন্দা হইল শিউলির মেয়ে, শিউলি হইল আমার মায়ের পেটের বোন। ওর জন্মের সময়ই তো বোনটা মরে গেল!’
-‘ও!’
মহিলা জানালা দিয়ে থুক করে থুথু ফেললেন। ঠোঁটের দুইপাশ দিয়ে গাল বেয়ে পানের লাল কষ বেরিয়ে আসছে। মহিলা প্রবলভাবে সেগুলোকে জিহ্বা দিয়ে মুখের মধ্যে নেওয়ার চেষ্টা করছেন! নাবিলা লম্বা করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। শেষ পর্যন্ত মহিলার মুখ বন্ধ হয়েছে!

বাস প্রতিবার ব্রেক করার সাথে সাথে ডান দিকে দাঁড়ানো লোকটা নাবিলার গায়ের উপর হেলে পড়ছে। নাবিলার ধারণা লোকটা ইচ্ছে করে বেশি ঝুঁকে আসছে। মহিলা হঠাৎ করে খেঁকিয়ে উঠলেন, লোকটার কনুইয়ে গুঁতা দিয়ে বললেন- ‘ওই মিয়া, চোখে দেখেন না? মেয়ে মানুষ দেখলেই গায়ের ওপর পড়ে যান! সরেন।’
লোকটা সরে গেল। এই প্রথম নাবিলা এই বিরক্তিকর মহিলার প্রতি ভালোলাগা অনুভব করতে লাগল। ‘কোথায় নামবেন?’
-‘শাহবাগ। আপনি কই নামবেন?’
-‘আমিও শাহবাগ।’
মহিলা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। ‘ভালোই হল। আপনার সাথে গল্প করা যায়, কী বলেন?’
-‘জ্বি।’ নাবিলার মনে হল, শাহবাগের আগেই কোথাও নেমে পড়া উচিৎ। রাস্তায় জ্যাম, শাহবাগ পৌঁছতে আধঘণ্টার বেশি সময় লাগবে। এর মধ্যে মহিলা কান ঝালাপালা করে দিতে পারেন!
-‘পড়াশুনা করেন নাকি?’
নাবিলা বলল- ‘জ্বি। আমার নাম নাবিলা। আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন।’
মহিলা বললেন- ‘তা তো পারিই। বয়সের হিসাব করলে তো তুমি পোনামাছ!’ মহিলা ঠা-ঠা করে হাসতে লাগলেন। সামনের সিট থেকে হিপহপ টাইপের একটা ছেলে মাথা বের করে বলল, ‘চাচী, আস্তে হাসেন। বাসা-বাড়ি পাইছেন?’
মহিলা আবার হাসতে লাগলেন- ‘দেখো কারবার, আমি এই পুঁচকে ছোকরার চাচী হইলাম ক্যামনে? ওর ছোট চাচায় কি আমারে বিয়া করছিল?’
নাবিলার মনে হল, মহিলার রসিকতায় তার একটু হাসা উচিৎ। কিন্তু একটু আগের পোনামাছ মাথার মধ্যে কিলবিল করতে লাগল। হিসাব করলে মহিলার বয়স নাবিলার দ্বিগুণ হবে, তার মানে তো এই না যে সে পোনামাছ!

বাসের ভাড়া দেওয়ার জন্যে মহিলা ব্যাগের খুললেন। বেশ কিছুক্ষণ হাতড়ে একটা জীর্ণ বিশ টাকার নোট বের করলেন কন্ডাক্টরের হাতে দিলেন। নাবিলা আড়চোখে মহিলার ব্যাগের দিকে তাকাল। ব্যাগের বয়স অনুমান করা যাচ্ছে না, তবে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ধকল গেছে ব্যাগটার উপর দিয়ে, এটা নিশ্চিত। মাঝেমাঝে অবশিষ্ট রেক্সিনের ছিটেফোঁটা দেখা যাচ্ছে। ব্যাগের বাইরের দিকের একটা পকেট সেলাই করে আটকানো। কালো ব্যাগের শরীরে হলুদ সুতো জ্বলজ্বল করছে। সেলাই করা পকেটটা বেশ উঁচু। ব্যাপারটা খটকা লাগার মতো; পকেটে যদি কিছু থাকেই তাহলে সেটা সেলাই করা থাকবে কেন! হেরোইন-টেরোইনের ব্যবসা করে না তো?

নাবিলা ধীরে ধীরে মহিলার কাছে সরে গেল। হাত দিয়ে একটু চাপ দিল, মনে হচ্ছে ধাতব কিছু। হাত সরিয়ে নিতেই মহিলা বললেন- ‘কিছু বুঝতে পারছ?’
নাবিলা একেবারে হকচকিয়ে গেল। বলল- ‘কী?’
মহিলা শাড়ির আঁচল দিয়ে পানের কষ মুছলেন। বললেন- ‘শোনো, আমার ব্যাগের মধ্যে কী আছে এইটা আমি কাউরে বলি না। কাছের এক-দুইজন মানুষ ছাড়া কেউ জানেও না। কিন্তু তোমারে বলব। কেন বলব জানো?’
-‘কেন?’
-‘না, সেই কারণটা তোমারে বলব না!’

ব্যাগ থেকে যে জিনিসটা বের হয়েছে সেটা দেখে নাবিলা পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। একটা টেলিফোন রিসিভার। হালকা সবুজ রঙয়ের। এটার অবস্থাও মহিলার ব্যাগের মতোই, রংচটা।
মহিলা বললেন- ‘এটার বয়স কতো জানো?’
রিসিভারের চেহারায় আদ্যিকালের ছাপ আছে। নাবিলার ধারণা, অন্তত বছর বিশেক হবে। বলল- ‘না।’
মহিলা শাড়ির আঁচলে রিসিভারটা মুছতে মুছতে বললেন- ‘তেতাল্লিশ বছর।’

আজিজ মার্কেটে ফয়সাল অপেক্ষা করছে। নাবিলা বলেছিল দশটার আগেই পৌঁছে যাবে। ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা। অনেক দেরি হয়ে গেছে। ফয়সাল হয়তো রাগ করে বসে আছে। কিন্তু নাবিলার মনে হল মহিলার পুরো গল্পটা শোনা উচিৎ।

(চলবে…)
পর্ব-২ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

(মোট পড়েছেন 360 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন