চন্দ্রাহত (পর্ব-০১)

- নাজমুল আহসান

১)
মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন বদরুল। সম্ভবত এই চোখকে পটলচেরা চোখ বলে। পটলকে লম্বালম্বি চিরে ফেললে যেমন দেখায়, কিছুটা সেরকম! চোখে একই সঙ্গে অদ্ভুত সৌন্দর্য আর মায়া। দরজার চৌকাঠ পার হয়েই মেয়েটা দাঁড়িয়ে গেল। বদরুল বললেন- ‘আসুন।’

গুটিসুটি পায়ে মেয়েটা বদরুলের টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল। ভ্যানিটিব্যাগের ভিতরে হাত দিয়ে কিছু একটা খুঁজলো। কিছুক্ষণ খুঁজে না পেয়ে হতাশ চোখে বদরুলের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাসে একটা হাসি দিল। সামনের চেয়ারটার দিকে ইঙ্গিত করে বদরুল বললেন- ‘বসুন’
-‘স্যার, আমার নাম আনিকা।’

বদরুল আবার মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন। মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিল। বদরুলের মনে হল- দূর থেকে যতোটা সুন্দর ভেবেছিলেন, আসলে এই মেয়ের চোখ ততো সুন্দর না। চোখের পাপড়িগুলো খুব বেশি লম্বা; এতো লম্বা পাপড়ি ভালো দেখাচ্ছে না, একটা মেকি মেকি ভাব আছে।
-‘ও, আচ্ছা। কী যেন বলছিলেন?’
মেয়েটা বলল- ‘আমার নাম আনিকা।’
-‘আসল নাম?’
-‘জ্বি স্যার।’
-‘ব্যাগে কি টিস্যু পেপার খুঁজছিলেন?’
মেয়েটা হাসল, ‘না স্যার, রুমাল।’

বদরুলের মনে হল, মেয়েটার চোখের চেয়ে হাসি সুন্দর। বক্স থেকে টিস্যু পেপার বের করে মেয়েটার হাতে দিয়ে বললেন- ‘আমার নাম বদরুল আনোয়ার।’
-‘আমি জানি স্যার।’
-‘আর কী কী জানেন?’
-‘আপনি এই কোম্পানির জিএম। আপনি খুব ভালো মানুষ।’
বদরুল বললেন- ‘মনে হচ্ছে আপনি আজই প্রথম। আমাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করছেন; এই চেষ্টাটা ভালো। কিন্তু সেটার দরকার নেই, আমি ইতোমধ্যে মুগ্ধ হয়ে গেছি। আপনি অনেক সুন্দর করে হাসেন।’
আনিকা আবার হেসে উঠলো, ‘আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন। আমি আপনার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট।’
-‘হ্যা, তা ঠিক। আমার বড় মেয়েটার সমবয়সী।’

কথাটা বলেই বদরুলের মনে হল- মেয়ের প্রসঙ্গ তোলা ঠিক হয়নি। বললেন- ‘চল, উঠি।’

২)
মিলি যখন বাসা থেকে বের হচ্ছিল, মা তখন রান্নাঘরে ছিলেন। তড়িঘড়ি করে বের হয়ে এলেন, ‘মিলি, আজ কি তোর ফিরতে দেরি হবে?’
মিলি বলল- ‘বলতে পারছি না মা। অফিসের ব্যাপার, জানোই তো!’
-‘ফারুক ফোন দিয়েছিল, বলল ওরা আজ আসবে।’
মিলি বলল- ‘দেখি।’

ফারুক মিলির মামাতো ভাই। ফারুকের ধারণা-তাঁর তৎপরতা ছাড়া মিলির মতো বোকা মেয়ের বিয়ে দেওয়া সম্ভব না। গত দুই মাসে অন্তত দশটা বিয়ের প্রস্তাব এনেছেন! সর্বশেষটা যে ছেলের খবর নিয়ে এসেছেন, সে ডাক্তার। ফারুক ভাই পরশু রাতে ফোন দিয়ে মাকে বলেছেন- ‘ফুপু, এই ছেলে যদি আপনার পছন্দ না হয়; তাহলে আমি ফারুক কানে ধরলাম, জীবনে মিলির বিয়ে নিয়ে কথা বলবো না।’
মা বললেন- ‘শুধু আমার পছন্দ হলেই তো হবে না, মিলির তো পছন্দ হতে হবে। তাছাড়া ছেলেপক্ষ মিলিকে পছন্দ করবে কিনা সেটাও দেখার বিষয়। ডাক্তার ছেলে কি আর যাকে তাকে পছন্দ করবে বাবা!’

মিলির মাথার মধ্যে ডাক্তার শব্দটা ঘুরতে লাগলো। কলেজের শুরুর দিকে রবিনকে ভালো লাগতো মিলির। এই ভালোলাগা একসময় ভালবাসা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কলেজ পাশ করে দুজন আলাদা হয়ে গেল; মিলি মফস্বলে আর রবিন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। এবং প্রায় সাথেসাথেই রবিন মিলিকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল।আকারে ইঙ্গিতে মিলিকে বোঝাতে লাগলো, তাদের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। তারপর হঠাৎ করেই সব শেষ!

অফিসে পৌঁছে মিলি বুঝতে পারল আবহাওয়া বেশ থমথমে। বড় একটা ক্লায়েন্ট হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, বসের মাথা গরম। জাবেদ ভাই বললেন বস দেখা করতে বলেছেন, এর মধ্যে তিন বার খোঁজ নিয়েছেন- মিলি এসেছে কিনা। ক্লায়েন্ট হাতছাড়া হচ্ছে, এর সাথে মিলির সম্পর্ক কী সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

বেশ দুরুদুরু বুক নিয়ে মিলি যখন বসের রুমে ঢুকল, তখন ঘড়িতে এগারোটার মতো। মিলি বলল- ‘স্যার, আমাকে ডেকেছেন?’
বস হাসলেন, বললেন- ‘বসো মিলি।’
মিলি বসলো। বস একটা খাম এগিয়ে দিলেন, ‘এটা তোমার জন্যে।’
-‘এটা কী স্যার?’
-‘সাজ্জাদকে আমাদের চিটাগাং অফিসে বদলি করা হয়েছে। এখন থেকে ওর চেয়ারটায় তুমি বসবে।’
মিলি অবাক হয়ে গেল! সাজ্জাদ ভাই মিলির চেয়ে দুই পোস্ট উপরে ছিলেন, একেবারে এমন প্রোমোশন মিলির কল্পনাতেও ছিল না। বলল- ‘কিন্তু, স্যার..’
-‘হ্যা, আমি জানি। শোনো মিলি, তোমার একই পদে এবং তোমার চেয়ে দক্ষ লোক আমাদের এখানে আছে। তোমাকে বাছাই করেছি, কারণ তোমাকে আমি অনেক পছন্দ করি।’
-‘থ্যাংক্যু স্যার। আমি কি এখন আসব?’
-‘হ্যা, এসো। আরেকটা কথা।’ বস থামলেন।
মিলি বলল- ‘জ্বি, স্যার। বলুন।’
-‘আমি জানি এই প্রোমোশনটা তোমার খুব দরকার ছিল। তোমার সেই উপকার করলাম, বিনিময়ে আমি কি কিছু চাইতে পারি?’

(চলবে…)

(মোট পড়েছেন 221 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন