সম্প্রদান

- নাজমুল আহসান

নীলা যখন পার্কে পৌঁছল তখন ঘড়িতে সাড়ে চারটার মতো। অফিস থেকে সোজা এখানে চলে এসেছে। পার্কের এদিকটায় আলোআঁধারির খেলা। পশ্চিম দিকটা তুলনামূলক নিরিবিলি, ওখানেই ওর থাকার কথা। একটা বেঞ্চে বসে ফোন বের করলো। আজ ফিরতে একটু দেরি হবে, মাকে জানানো দরকার।

ভার্সিটিতে পড়ার সময়টা পর্যন্ত নীলা প্রায়ই এখানে আসতো, বন্ধুদের সাথে। পড়াশুনার পাট চুকিয়ে সবাই যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এখন পার্কে সবাই মিলে আড্ডা দেওয়া তো দূরের কথা, দেখা-সাক্ষাতও হয় না কারো সাথে! মাস দুয়েক আগে হঠাৎ তুহিন একদিন বাসায় হাজির হয়েছিল, বউ নিয়ে। বলল, এই এলাকাতেই থাকছে, আবার আসবে। তারপর থেকে তুহিনেরও খোঁজ নেই! নীলা প্রায়ই ভাবে, হুটহাট করে একদিন কোনো বন্ধুর বাসায় হানা দেবে, সময় হয় না।

কাল সন্ধ্যায় একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলো। ফোনের ও প্রান্ত থেকে এক ভদ্রমহিলা নিজের পরিচয় দিলেন কলেজের টিচার হিসেবে, নাম বললেন না! নীলাকে খুব ভালো করে চেনেন দাবি করে বললেন, ওর সঙ্গে দেখা করতে চান। খুব বিনীত ভঙ্গিতে কথা বললেন। জানালেন, দেখা করা খুব দরকার। নীলা বেশ ঘাবড়ে গেল! চেনা নেই, জানা নেই, দেখা করতে চাচ্ছেন! ও বলেছিল ওর অফিসে কিংবা বাসায় আসতে, মহিলা রাজি হননি। অগত্য নীলা রাজি হল, একটা রেস্টুরেন্টে আসতে বলল। ভদ্রমহিলা এবার আপত্তি জানালেন, উনি রেস্টুরেন্টে আসতে পারবেন না। শেষমেশ এই পার্কে দেখা করার কথা চূড়ান্ত হয়েছিল।

বিষয়টা নীলা ভুলে গিয়েছিল। আজ অফিস থেকে বের হওয়ার সময় শারমিন বলল, ‘ম্যাডাম, কাল আমার ছুটি দরকার। ছেলেটার ভর্তির কাজ সারতে ওর কলেজে যেতে হবে।’
কলেজ শুনেই নীলার মনে পড়লো কাল ও ভদ্রমহিলাকে কথা দিয়েছিল, আজ দেখা করবে। অফিস থেকে বের হয়ে সোজা এখানে চলে এলো নীলা। মাথায় কিছুটা দুশ্চিন্তা কাজ করছিল; কে না কে, কোন বিপদে ফেলে কে জানে!

নীলা যেখানে বসেছে, সেখান থেকে পার্কে ঢোকার পথটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গেটের সামনে রিকশা থেকে এক মাঝবয়সী মহিলা নামলেন, ভিতরে ঢুকে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। এই মহিলাই কি ওর সাথে দেখা করতে আসছেন? সামনে তাকিয়ে হাঁটতে লাগলেন মহিলা, ভিতরের দিকে এসে আবার দাঁড়ালেন! তারপর হঠাৎ করে ডানদিকে ঘুরে চলে গেলেন!
নীলা এবার সেলফোন বের করলো। গতকালের নম্বরে ফোন দিল। বলল, ‘আপনি কি পার্কের ভিতরে ঢুকেছেন? আমি এই যে পশ্চিম দিকে বসে আছি!’
ওপ্রান্ত থেকে মহিলা অপ্রস্তুত জবাব দিলেন, ‘না, আমি তো এখনো পৌঁছাইনি! আপনি একটু ওয়েট করুন, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে আসব!’ নীলা আবার গেটের দিকে তাকাল।

সামনে দাঁড়ানো শাড়ি পড়া মেয়েটাকে দেখে অবাক হয়ে গেল নীলা! অদ্ভুত! মানুষ এতো সুন্দর হয় কী করে? সাক্ষাৎ প্রতিমা! বয়স কতো হবে, তেইশ-চব্বিশ! সৌন্দর্য যেন ঠিকরে বের হচ্ছে! নীলা বলল, ‘আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?’
-‘আপনি নীলা?’
-‘জ্বি। আপনিই কি আমাকে ফোন দিয়েছিলেন?’ নীলা বুঝতে পারছে না, এই মহিলার কী কাজ থাকতে পারে তার সাথে!
মহিলা বসলেন। নীলার মনে হল, মহিলার বয়স আরেকটু বেশি হবে; ছাব্বিশ-সাতাশ। ওর হাতের উপর হাত রেখে মহিলা বললেন, ‘আমার নাম শায়লা।’
নীলার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। কোন শায়লা? ও কী করবে এখন, উঠে চলে যাবে? আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে, ও যা ভাবছে সেটা ঠিক না। ইনি হয়তো অন্য কোনো শায়লা! তারপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্যে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন শায়লা? আমি কি আপনাকে চিনি?’
শায়লা হাসলেন, ‘আমার ধারণা, আপনি আমাকে চেনেন। আপনি যা ধারণা করেছেন, সেটা ঠিক। আমি সেই শায়লা!’
মহিলার কথা বলার ধরন দেখে নীলা কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারল, অন্তত ভয়ের কোনো কারণ নেই।
শায়লা আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমি আপনাকে দেখা করতে বলেছি বটে, কিন্তু আপনি যে সত্যি আসতে রাজি হবেন ভাবিনি। আর ফোনে কেন পরিচয় দেইনি, বুঝতেই পারছেন। আমি নিশ্চিত, আমার পরিচয় জানলে আপনি আসতেন না। ঠিক বলেছি কিনা বলুন।’
-‘আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন।’ প্রায় ফিসফিস করে বলল নীলা।
মুচকি একটা হাসি দিলেন শায়লা। নীলা আবার অবাক হয়ে গেল, এতো মিষ্টি হাসি হয় মানুষের! হঠাৎ মনে হল, দুনিয়ার সব পাপ ওকে ঘিরে ধরছে! ও কি শায়লার কাছে ক্ষমা চাইবে? শায়লা কি ক্ষমা করবেন?
-‘আচ্ছা, তুমি করেই বলব। অবশ্য আমাদের মধ্যে যে সম্পর্ক তাতে তুমি’র মতো একটা সুন্দর শব্দ মানায় না! আচ্ছা, সে যাক…’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শায়লা আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমি তোমাকে ডেকেছি একটা গল্প বলতে আর একটা অনুরোধ করতে।’
-‘জ্বি বলুন।’
-‘গ্রামের একটা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করলাম। অনেক ভালো রেজাল্ট হল। বাবা-মা’র ইচ্ছে ছিল মফস্বলে থেকেই ডিগ্রীতে পড়ি। আমি জেদ ধরে বসলাম, ভার্সিটিতে পড়বো। মোটামুটি সবার অমতে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে অনেক ভালো একটা সাবজেক্টে চান্স পেলাম। এবার বাবা-মা নরম হলেও সমস্যা দেখা দিল আমার থাকা নিয়ে নিয়ে। কোথায় থাকবো? হলে সিট পাওয়া যায় না। মেয়েদের হোস্টেল আছে, কিন্তু সেখানে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ঢাকায় আত্মীয়স্বজন বলতে মা’র দূরসম্পর্কের এক চাচাতো ভাই, আমাদের সাথে যোগাযোগ নেই। এসব নিয়ে ভর্তি যখন অনিশ্চিত, তখনই জমিজমা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মা’র সাথে আলাপ হল আমার সেই মামার। আর কথা প্রসঙ্গে আমার ভর্তি আর থাকার সমস্যার কথা তাঁকে জানিয়ে দিলেন মা।’

এ পর্যন্ত বলে শায়লা হাপাতে লাগলেন। নীলা পানির বোতলটা এগিয়ে দিল। ঢকঢক করে অর্ধেক বোতল পানি খেয়ে ফেললেন শায়লা। নীলা বলল, ‘তারপর?’
-‘তারপর সেই মামার সাথে আমি ঢাকায় চলে এলাম। বলতে গেলে মামা-ই আমাকে জোর করে নিয়ে এলেন। আমি ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। মামা আমাকে অসম্ভব ভালবাসতেন, স্নেহ করতেন। দুইটা মামাতো বোন, ভার্সিটি নিয়ে বেশ সুখে দিন যেতে লাগলো আমার। কিন্তু সুখ বেশিদিন কপালে সইল না।’
-‘কেন?’
-‘আমি আসার এক বছরের মাথায় মামা মারা গেলেন। ওখানে আর থাকা হল না। হলে চলে এলাম। ততদিনে অনেকেই পরিচিত হয়েছে, একটা সিট ম্যানেজ করেছিলাম। আচ্ছা, শোনো-’
নীলা বলল, ‘জ্বি, শুনছি।’
-‘এসব কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক। তোমার হাতে সময় আছে তো?’
আজ সন্ধ্যায় মা’কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা নীলার। কিন্তু ওর কেন যেন মনে হচ্ছে, এই মহিলার গল্পের পুরোটুকু শোনা দরকার। বলল, ‘না, না; সমস্যা নেই। আপনি বলুন।’
শায়লা শুরু করলেন, ‘হলে ওঠার মাস-খানেকের মধ্যে পরিচয় হল ফাহানের সাথে।’ বলেই আড়চোখে নীলার দিকে তাকালেন শায়লা। নীলা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো।
-‘ফাহান তখন ফাইনাল ইয়ারে। জানো, ওর মধ্যে অদ্ভুত একটা জাদুকরী ক্ষমতা আছে! আমি খুব দ্রুত ওর প্রেমে পড়ে গেলাম। ও তখন হলে থাকতো।’
-‘তারপর?’
-‘হলে সবসময় ঝামেলা, পড়াশুনা কিচ্ছু হয় না। ওর আরেকটা ফ্রেন্ডের সাথে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলো। শুরুতে ও রাজি হচ্ছিল না, আমি প্রায় জোর করেই ওকে রাজি করালাম।
ওদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না, আমি জানতাম। নিজের লেখাপড়ার খরচ নিজে চালাত। কিন্তু অভাবটা আমাকে কখনোই টের পেতে দেয়নি। ঈদে-পূজাপার্বণে আমার জন্যে দামি দামি গিফট আনত। হল ছেড়ে নতুন বাসায় আসার পর আর্থিক দিকটা জোর সমস্যা হয়ে গেল। হলে থাকতে দুইটা টিউশনি করতো, সেগুলো বন্ধ হয়ে গেল। আমাকে কিছু বলতো না। একদিন জানতে পারলাম, আমাকে নববর্ষে যে শাড়ি উপহার দিয়েছে, সেটা বন্ধুর কাছে টাকা ধার করে কেনা। আমার জীবনের প্রথম শাড়ি। ব্যাপারটা যে খুব গুরুতর তা না, কিন্তু আমি একটা ধাক্কা খেলাম।’
নীলা বেশ ইতস্তত করে বলল, ‘কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করবো?’
-‘করো।’
-‘আপনি এখন যে শাড়িটা পড়ে আছেন, সেটা কি এই শাড়ি?’
শায়না হাসলেন, ‘তুমি বুদ্ধিমতি। ঠিক ধরেছ।’
নীলা বলল, ‘তারপর?’
-‘আমি তখন থার্ড ইয়ারে পড়ি। বান্ধবী আর হলের বড় আপুদের ধরে একটা টিউশনি ম্যানেজ করলাম। কিছুদিন পর আরেকটা। আমি টিউশনি শুরু করেছিলাম ওকে না জানিয়ে। প্রথম মাসের টাকাটা নিয়ে গিয়ে ওকে দিলাম। ও নিবে না, বেশ রাগারাগি করলো। আমি কেন এসব করতে গেছি! আমি শেষে কান্নাকাটি করে টাকাটা নিয়েই চলে এলাম। পরে অবশ্য ওকে রাজি করিয়েছিলাম, বলেছিলাম টাকাগুলো ধার হিসেবে দিচ্ছি। বিয়ের পর সুদেআসলে ফেরত নেবো!’
খিলখিল করে হাসতে লাগলেন শায়লা। ‘এর মধ্যে ওর পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। অপ্রত্যাশিতভাবে খুব ভালো একটা জব পেয়ে গেল ফাহান। আমাদের কষ্টের অধ্যায় শেষ হল।’
-‘তারপর?’
-‘আমাদের সম্পর্কের কথা বাবা-মা কাউকে এতদিন জানাইনি। ও চাকুরি পেয়ে যাওয়ার পর একবার বাড়িতে গিয়ে মা’কে জানালাম। ওদের পারিবারিক দিকটা শুনে মা রাজি হলেন না। আমাকে কঠিন করে বলে দিলেন, ফাহানের সাথে যেন যোগাযোগ না রাখি। আর বাবা যেন না জানেন!
ঢাকায় চলে এলাম। তারপর জীবনে অন্যতম একটা ভুল করলাম আমি; বাবা-মাকে না জানিয়ে, পরিবারের মুখে চুনকালি মাখিয়ে আমি আর ফাহান বিয়ে করলাম। ভেবেছিলাম, কিছুদিন পর গিয়ে বাবা-মাকে জানালে সব মেনে নিবেন। কিন্তু ঘটলো উল্টোটা। খবর পেয়ে বাবা হার্টএটাকে মারা গেলেন।
বাবাকে আমি অসম্ভব ভালবাসতাম। বাবা চলে গেলেন; আমি ফাহানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকলাম। সুখ বলে আসলেই কিছু আছে, আমি পলেপলে অনুভব করতে লাগলাম। অপূর্ণতা জিনিসটা আমার জীবনে থাকলো না।’
শায়লা থামলেন, নীলার দিকে তাকালেন। নীলা মাথা নিচু করে ফেলল। ‘আরও শুনবে?’
-‘জ্বি, বলুন।’
-‘সবার কপালে নাকি সুখ সয় না। আমার কপালেও সইল না। আমাদের দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকীতে ওর এক কলিগ এসেছিলেন আমাদের বাসায়। বিজয় ভাই। ভদ্রলোক নতুন বিয়ে করেছেন। উনি আর উনার স্ত্রী দুজনে আমাকে ডেকে সব বললেন। আমি শুনে বিশ্বাস করতে পারিনি। জানো, আজও আমার বিশ্বাস হয় না! তবে, সেদিন আমি অবিশ্বাস করলেও মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগলো। বিষয়টা মাথা থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলতে পারলাম না। ওকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি কখনো, আমি চাইনি আমাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হোক। বিজয় ভাইও পরে আর কিছু বলেননি। আমি ধীরে ধীরে বিষয়টা ভুলে যাচ্ছিলাম। হয়তো যেতামও, কিন্তু হল না। একটু পানি খাবো…’

নীলা পানির বোতল বের করে দিল। শায়লা আবার বলতে লাগলেন, ‘সেদিন ওর অফিসের কী একটা কাগজ বাসায় রেখে গিয়েছিল। অফিস থেকে পিয়নকে পাঠিয়েছিল কাগজটা নিতে। আমি সাধারণত ওর কাগজপত্রে হাত দেই না, সেদিনই প্রথম। অফিসের সেই কাগজ খুঁজতে গিয়ে তোমাদের বিয়ের কাবিননামা আমার হাতে পড়লো। খোদার কসম নীলা, আমার জীবনে সেদিনের মতো কষ্টের মুহূর্ত আর আসেনি।
বিজয় ভাই যেদিন বললেন, তার কয়েকদিন পর আমি ওর অফিসে গিয়েছিলাম। কোন সৌভাগ্যবতী আমার জীবন কেঁড়ে নিচ্ছে, তাকে খুঁজতে। বিজয় ভাই তোমার নাম বলেননি। আর আমি তুমি বোধহয় ছিলে না সেদিন অফিসে।’
নীলা মাথা নিচু করেই বলল, ‘ছিলাম।’
-‘কাবিননামাটা দেখেছি গত সপ্তাহে। ফাহানকে কিছু বলিনি। আমার ধারণা ও বুঝতেও পারেনি। এই কয়টা দিন ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর দিন। কাল রাতে ওকে জিজ্ঞেস করলাম। ও শুরুতে সবকিছু হেসে উড়িয়ে দিল। বলল বিজয় ভাই নাকি আমার সাথে মজা করেছে! আমি আর কিছু বললাম না। পুরো রাতটা ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকলাম। সারারাত একটুও ঘুমাইনি, বিশ্বাস করো।
সকালে উঠে ও প্রতিদিনের মতো অফিসে চলে গেল। আমি সুন্দর করে পুরো বাসাটা গোছগাছ করলাম। নিজে বাজার করে এনে ওর পছন্দের খাবারগুলো রান্না করলাম। দেয়াল থেকে আমাদের দুজনের সব ছবি নামিয়ে ফেললাম। অনেকদিন পর আজ বাইরে একটা রেস্টুরেন্টে খেলাম। আমাদের যখন নতুন বিয়ে হয়, তখন আমরা মাঝেমাঝেই ওই হোটেলটায় খেতে যেতাম।’ শায়লা থামলেন।
-‘নীলা?’
-‘বলুন।’ নীলা আড়ালে চোখ মুছল।
-‘আমার গল্প তো শেষ। এখন একটা অনুরোধ-’
-‘জ্বি, বলুন।’
-‘ফাহানকে আমি এখনো অনেক ভালবাসি। আর এই ভালবাসাটা কখনোই কমবে না। আমি ওকে সজ্ঞানে কখনো কষ্ট দিয়েছি মনে পড়ে না। তোমাকে একটা অনুরোধ করি, ওকে কখনো কষ্ট দিও না। ও খুব আবেগপ্রবণ আর অল্পতেই রেগে যায়, এগুলো একটু মানিয়ে নিও।
আরেকটা কথা, ও কিন্তু একদম ঝাল খেতে পারে না। কই মাছটা খুব পছন্দ করে। তুমি নিশ্চয়ই ওর পছন্দ-অপছন্দ জানো; তারপরও বললাম। একদিন হয়েছে কী, শোনো। আমি তো কই মাছ খেতে পারি না, ও আমাকে জোর করে খাওয়াবে! আমি খাবই না, ফাহান ছাড়বেই না! শেষ পর্যন্ত একটা মাছের অর্ধেকটা ও নিজেই জোর করে আমার মুখে ঢুকিয়ে দিল! কী আর করা, অগত্য চোখ বন্ধ করে চিবোতে লাগলাম। অনিচ্ছায় কাজ করলে যা হয়, গলায় মাছের কাঁটা আটকে গেল! বাইরেও আসে না, গিলেও ফেলতে পারি না! মুখ বন্ধ করে আছি দেখে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে; বললাম, কিছু হয়নি। কিন্তু ও বুঝতে পারলো। আমাকে বলল, ‘চলো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই’! আমি যতই বলি, এটা কোনো ব্যাপার না, ঠিক হয়ে যাবে; ও শোনে না! শেষ পর্যন্ত অবশ্য মানাতে পারলাম, কিন্তু ও খুব অনুশোচনায় ভুগতে লাগলো। বারবার আফসোস করছিল, কেন আমাকে জোর করে খাওয়াতে গেল! আমার গলা থেকে কাঁটা নামতে দুদিন লেগেছিল, এই দুদিনে ও অন্তত দুইশ’বার আমাকে জিজ্ঞেস করেছে- কাঁটা খুলেছে কিনা, ব্যথা করেছে কিনা! আজ ওর জন্যে যখন রান্না করছিলাম, তখন কেন যেন সেদিনের কথা মনে পড়ছিল খুব। ও নিশ্চয়ই তোমাকেও এরকম আদর করে, জোর করে কই মাছ খাওয়াবে! তুমি কই মাছ খাও তো নীলা?’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শায়লা বললেন, ‘আচ্ছা, নীলা, চলো উঠি। নাকি?’
-‘জ্বি।’
-‘ও হ্যা, আরেকটা কথা বলতে ভুলে গেছি। আমি যে তোমাদের বিয়ের কাবননামা দেখেছি, এটা ফাহান জানে না। আমি বাসা থেকে চলে এসেছি, এটাও জানে না। তুমি একটু ওকে জানিয়ে দিও।’
শায়লা উঠে দাঁড়ালেন। নীলার হাত ধরে টেনে তুলে বললেন, ‘তুমি মন খারাপ করো না। সব আমার কপালে ছিল। তুমি কি আমার শেষ একটা অনুরোধ রাখবে?’
নীলা বলল, ‘কী?’
-‘আমি ওর জন্যে রান্না করে রেখে এসেছি। তুমি আজ রাতে ওকে সঙ্গে নিয়ে খাবে।’
নীলা শায়লার হাত ধরল, ‘আপনি কোথায় যাবেন?’
শায়লা বললেন, ‘জানি না। যেতে যেতে পথ খুঁজে নেবো। তোমরা ভালো থেকো। আর ফাহানকে বলো, আমি ওকে অনেক ভালবাসি।’

শায়লা চলে গেলেন। নীলার হঠাৎ মনে হল, কোথাও একটা ভুল হয়ে গেছে!

(মোট পড়েছেন 154 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

২টি মন্তব্য

  1. সিয়াম সিয়াম বলেছেন:

    ভাই আপনার লেখা ভালো লাগছে।কিন্তু সাইটে ঢুকেই যে বিজ্ঞাপন দেখলাম….. ^:^ ^:^ ^:^ ^:^

    1. বিপুল বলেছেন:

      ভাই, একটা সাইত চালাইতে খরচ আছে। বিগজ্ঞাপন দিতেই পারে। সমস্যা কি?

মন্তব্য করুন