সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প রামু থেকে নাসিরনগর

- মাহবুবুল আলম

৩০ অক্টোবর রবিবার  ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার নাসির নগর উপজেলায় ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে মন্দির এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরীফ অবমাননা করে আপত্তিকর ছবি পোস্ট করার প্রতিবাদে মিছিল চলাকালে নাসিরনগর উপজেলা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়ি-ঘর ও মন্দিরে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নাসিরনগর গৌর মন্দির, দত্তবাড়ি মন্দির, কালিবাড়ি মন্দির, জগন্নাথ মন্দিরসহ ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নাসির নগরে হিন্দুদের শতাধিক বাড়ি-ঘরে হামলা-ভাঙচুর এবং লুটপাট করা হয়৷ সেদিন অন্তত ১০টি মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়৷ হিন্দু পল্লিতে নারী-পুরুষকে বেধড়ক পেটানো হয়। রামুতে বৌদ্ধমন্দিরে যেভাবে ফেসবুক পোস্টের অজুহাত তুলে হামলা চালানো হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও একইকায়দায় হামলা চালানো হয়। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে একটি ফেসবুকে ইসলামের অবমাননা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে বৌদ্ধ বস্তিতে যেভাবে হামলা হয়েছিল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলা তাদের মন্দিরবাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ভাংচুরের মতো তাবও একই ধরনের সন্ত্রাস এবং নাশকতা একই ধরনের।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা টিভি চ্যানেলের খবরে দেশের মানুষ ইতোমধ্যে জেনে গেছে যে, নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ দাস ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে ইসলামের অবমাননা করে কথা ছড়িয়ে পড়লে রসরাজ দাসকে পুলিশ আটক করে এবং আদালতে প্রেরণ করে কারাগারে পাঠায়। তারপরও একটি ইসলামী সংগঠন সেখানে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। এর সমর্থনে মাইকিংও করা হয়। মাইকিংয়ের মাধ্যমে অনেকউস্কানিমূলকস্লোগানও সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছে। তবে সবচে’ আশ্চর্যজনক খবর হলো যে,  ওই সমাবেশে স্থানীয় প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ অংশ নেন। মসজিদে মসজিদে মাইকে ঘোষণা করে বিক্ষোভ মিছিলে সবাইকে যোগ দিতে বলা হয়, দুপুর বারোটার ভেতরে অনেক মানুষকে একত্র করে সবাই মিলে মন্দিরে মন্দিরে হামলা করতে শুরু করে।

নাসিরনগরে হামলার প্রত্যক্ষদর্শী এবং সার্বজনীন মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক নির্মল দাস ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘হামলার দিন ১২শ’র মতো তরুণ লাঠি ও দেশি অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়৷ মন্দিরের পুরোহিতের ওপরও হামলা চালানো হয়৷ তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন৷ হামলাকারীরা বাড়ি ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়, প্রতিমা ভাঙে৷” তারপর ও ওই ধর্মন্ধ ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তাদের উন্মত্ততা বন্ধতো করেইনি, বরং আরও উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে ধর্মপরায়ন মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তোলে আরও বড় অঘটনের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

নাসিরনগরে মন্দিরে হামলা ও ভাংচুর ঘটনায় এ নিয়ে এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের ভাংচুর মামলায় আসামি দেখানো হয়েছে। পুলিশের গ্রেফতার অভিযান চলছে। থানা থেকে সিসি টিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। এদিকে পবিত্র কাবা শরীফের ছবি ব্যঙ্গ করে মহাদেবের মূর্তি বসিয়ে দেয়ার ঘটনায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে গ্রেফতারকৃত রসরাজ দাসকে কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতের তাকে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করে। আদালত তাকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে তদন্ত কমিটি প্রধান চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন। তারা মন্দিরের পুরোহিত মামলার বাদীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সুধীজনদের সঙ্গে কথা বলেন।

এ প্রসংগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশিষ্ট লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ৪ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক জনকন্ঠে তার নিজস্ব‘সাদাসিদে’ কলামে বলেন,‘ …ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এলাকার এই মানুষগুলোর কাছে ক্ষমা চাইবার ভাষা আমার জানা নেই। আমি আমার হিন্দু ধর্মাবলম্বী সহকর্মী কিংবা ছাত্রছাত্রীদের সামনেও অপরাধী হয়ে আছি। আমরা সবাই জানি এই দেশে ধর্মান্ধ মানুষ আছে, কিভাবে কিভাবে জানি তাদের কাছে ধর্ম একটা বিচিত্র রূপ নিয়ে এসেছে। নিজ ধর্মের অবমাননা হয়েছে এই ধরনের একটা কথা ছড়িয়ে দিয়ে এই ধর্মান্ধ মানুষগুলো অবলীলায় অন্য ধর্মের মানুষের উপাসনালয় তছনছ করে ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, অন্য ধর্মের একেবারে নিরপরাধ মানুষটিকে নির্যাতন করতে পারে, অপমান করতে পারে। রামুতে যে ঘটনাটি ঘটেছিল আমরা কেউ সেটা ভুলিনি এবং সেটা কিভাবে ঘটানো হয়েছিল সেই ইতিহাসটুকুও আমাদের সবার স্পষ্ট মনে আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এলাকার ঘটনাটি হুবহু রামুর ঘটনার একটি পুনরাবৃত্তি ছাড়া কিছুই নয়।’

এ বিষয়ে আজ দৈনিক জনকন্ঠে চতুরঙ্গ পাতায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক মুহম্মদ শফিকুর রহমান ‘নৈরাজ্য না স্যাবোটাজ’ শিরোনামের কলামে লিখেছেন… নাসিরনগর উপজেলা সদর ইউনিয়নের লোকজন হামলা চালালে তাদের চেনা যেত। বরং আশপাশের গ্রাম ইউনিয়ন থেকে সমাবেশে যোগ দিতে আসা লোকজনের একটি অংশ সমাবেশে যোগ না দিয়ে এবং একটি অংশ সমাবেশ থেকে গিয়ে ওই হামলা চালায়। অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রশাসন জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ ওই সমাবেশে যাওয়ায় হামলাকারীরা উৎসাহিত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে পুলিশের গাফিলতি ছিল। তাহলে ধরে নিতে হবে হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং স্যাবোটাজ! ইতিহাস বলে এবং বেশি দিনের কথাও নয়, এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ারই সন্তান মাওলানা ফজলুল হক আমিনী (মৃত) স্লোগান দিয়েছিলেন’ ‘আমরা হব তালেবান, বাংলা হবে আফগান।বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম স্থানীয় এসপি মিজানুর রহমানের রিএ্যাকশন ছেপেছে যে’ হামলার জন্য জামায়াতশিবির দায়ীসুযোগসন্ধানী মহল সরকারকে বিব্রত করতে ঘটনা ঘটিয়েছে।এখানে একটা ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার। এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারীবেসরকারী চাকরিতে জামায়াতশিবিরের ঢুকে পড়া বন্ধ হয়নি, অব্যাহত আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাএমপিদের অনেকে অর্থের বিনিময়ে অথবা রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির ভ্রান্তমোহে এসব অপকর্ম করে চলেছে। এসব বন্ধ না হলে সমাজ থেকে সন্ত্রাস, মানবিক বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না।”

এত কিছুর পরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টায় নেমে পড়েছে দুর্বৃত্তরা। শহর ও শহরতলীর মসজিদ, মাদ্রাসায় দুর্বৃত্তরা তালা মেরে পবিত্র কাবা শরীফের বিকৃত ছবি সাঁটিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ঠেকাতে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয় বিশিষ্ট আলেমদের নিয়ে তাৎক্ষণিক সভা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, দুর্বৃত্তদের ধরতে অভিযান চালানো হয়েছে। নাসিরনগরে মন্দিরে হামলা ও ভাংচুর ঘটনায় আরও একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ নিয়ে এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে আরও জানা গেছে, বুধবার গভীর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বড় হুজুর সিরাজুল ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত শহরের ভাদুঘরে জামিয়া সিরাজিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার প্রধান ফটকে ২টি তালা মেরে দেয় দুর্বৃত্তরা। সেই সঙ্গে পবিত্র কাবা শরীফের ছবির উপর মূর্তি বসিয়ে বিরাট পোস্টার সাঁটিয়ে দেয়া হয়। ভোরে মাদ্রাসার ছাত্ররা এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। একইভাবে শহরের কাউতলী জামে মসজিদ ও শহরতলীর বিজেশ্বরে জামিয়াতুস সুন্নাহ মাদ্রাসায় একই কায়দায় পোস্টার সাঁটানো হয়। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জেলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘটনাটি জানান। সদর থানা পুলিশ খবর পেয়ে মাদ্রাসায় পৌঁছে তালা ভেঙ্গে গেট খুলে দেয়। একের পর এক এসব ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার জেরে পাশের জেলা হবিগঞ্জের মাধবপুরেও দুটি মন্দিরেও হামলা হয়।

তাই সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলার শীর্ষ আলেমদের নিয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমানের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান পিপিএম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঈনুর রহমান, জামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও জেলার প্রধান মুফতি মোবারক উল্লাহ, ভাদ ঘর জামিয়া সিরাজিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মনিরুজ্জামান সিরাজী, দারুল আহকাম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সাজিদুর রহমান, কাজীপাড়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা ইদ্রিস প্রমুখ। সভায় এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করার জন্য মাওলানাদের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়। জেলার সম্প্রীতি রক্ষা এবং উত্তেজনা নিরসনে সকলের সাহায্য ও সহায়তা কামনা করা হয় বৈঠকে। সভায় আগামী শনিবার জেলার সকল মসজিদ, মাদ্রাসার ইমাম, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঈনুর রহমান জানান, জেলা ও আশপাশে জেলার বিভিন্ন প্রেসে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে পোস্টার ছাপানোর সঙ্গে জড়িত এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।

শেষ করতে চাই এই বলেই যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে প্রথমে গুপ্তহত্যা, তারপর দেশব্যাপী রাস্তাগাছ কেটে যাতায়াত বাধাগ্রস্ত করা, পেট্রোলবোমা মেরে জ্বালিয়েপুড়িয়ে বাস ট্রেনযাত্রী বা পথচারী হত্যা করে সর্বশেষ গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তঁরায় জঙ্গি হামলা চালিয়ে বিশ বিদেশী নাগরিককে হত্যাসহ অনেক নিরীহ মানুষকে আহত করে দেশকে অসস্তিতিশীল করতে ব্যর্থ হয়ে আবার ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের দেশবিরোধী খেলায় মেতে ওঠেছে। কিন্তু দেশের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ কিছুতেই রামুর ঘটনা কিংবা নাসিরনগরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর দেখতে চায় না। তাই অবিলম্বে দেশবিরোধী এই অপশক্তিকে প্রতিহত করতে সরকারসহ সবাইকে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে যে কোন সময় দেশে এ ধরনের আরও ভয়াবহ ও ন্যাক্কারজনক ঘটতে পারে।

 

 

 

index

(মোট পড়েছেন 103 জন, আজ 1 জন)
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন